পাপিয়ার পথেই হেঁটেছে মুনিয়া

পাপিয়ার পথেই হেঁটেছে মুনিয়া

*টার্গেট ছিল উচ্চবিত্তদের 
*নিজেকে পরিচয় দিতেন কলেজছাত্রী
*পরিবারের আশকারায় হন বিপথগামী
*যাতায়াত ছিল অভিজাত হোটেলে

মেহেদী হাসান: শামীমা নূর পাপিয়া, অপরাধ জগতের এক লেডি গডমাদারের ভূমিকায় ছিলেন তিনি। সঙ্গে সখ্যতা ছিল দেশের অনেক মাফিয়া-প্রভাবশালীদের। 

নরসিংদীর বাগদী এলাকার গাড়িচালক সাইফুল বারীর মেয়ে পাপিয়া। এক সময় এলাকায় খুবই অভাবে দিন কাটলেও নিজের সৌন্দর্যের তকমা লাগিয়ে ঢাকায় এসে বনে যান লেডি মাফিয়া। সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গন, সন্ত্রাসী থেকে প্রভাবশালী, সবই যেন ছিল তার কব্জায়। স্কুল ও কলেজ জীবন থেকেই একাধিক ছেলের সঙ্গে ছিল তার প্রেমের সম্পর্ক। ফুঁসলিয়ে পালিয়ে বিয়ে করেন তৎকালীন নরসিংদী পৌরসভার মেয়র লোকমানের ডানহাত সুমনকে।

ভাগ্যের চাকা যেন খুলে যায় দুজনেরই। সুমনও অনেকদিন যাবতই খুঁজছিলেন এমন কাউকে, যাকে দিয়ে রাতারাতি বড়লোক হওয়া যায়। প্রভাবশালীকে ম্যানেজ করেই জেলা যুবমহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক বনে যান তিনি। গ্রাম থেকে ২০১৪ সালে ঢাকায় আসার পরই পাপিয়া শুরু করেন নারী ব্যবসা। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পপতি ও প্রভাবশালী মহলে নারী সাপ্লাই দিতেন তিনি। অনেক সময় নিজেও চলে যেতেন তাদের ডেরায়।

দেহকে পুঁজি করে টাকা কামানোই যেন ছিল তার নেশা। এছাড়াও ধনাঢ্য অনেককেই ফেলতেন ফাঁদে। নারী লোভী পুরুষদের বিভিন্ন মেয়েকে দিয়ে দৈহিক চাহিদা পূরণের ফোকরে গোপন ক্যামেরাই ছিল পাপিয়ার অন্যতম হাতিয়ার। প্রথমে টাকার বিনিময়ে মনোরঞ্জন পরে ঝোঁপবুঝে কোপ মারাই ছিল পাপিয়ার মূল পেশা। অনেক ব্যক্তিকেই গোপন ক্যামেরায় অশ্লীল ছবি/ভিডিও ধারণ করে করা হতো ব্ল্যাক মেইল বাণিজ্য। আমোদ-ফুর্তি আর নারীদের দিয়ে দেহব্যবসা এবং ব্ল্যাক মেইলিং-এর টাকার পাহাড়ে চলা আলোচিত নারী নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া এখন নির্জন কারাকক্ষে বন্দি। পাপিয়া গ্রেপ্তার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় পাপিয়ার অনেক অনুসারীরা।  

তাদেরকেও নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। অনেককেই আনা হয়েছিল আইনের আওতায়। তবে পাপিয়ার ডেরায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল যে মুনিয়ার, সে ছিল পাপিয়ার চেয়েও ভয়ঙ্কর। কয়েকদিন আগে গুলশান এলাকা থেকে পুলিশ তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে। এ বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে পৃথক দুইটি মামলা দায়ের করা হয়। প্রথমাবস্থায় মুনিয়ার বোন আত্মহত্যার প্ররোচনায় আনভির নামের এক শিল্পপতিকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করেন। এরপর থেকে বেড় হতে থাকে মুনিয়ার লাগামহীন অপরাধনামার তথ্য। মৃত্যুর আগে মুনিয়ার সঙ্গে কথা হয় তার বোন তানিয়ার সঙ্গে। মুনিয়ার সঙ্গে অনেকদিন যাবতই সম্পর্ক ভালো ছিল না তার। তাদের মাঝে অনেক দিনই কোনো কথাও হয়নি। তবে মুনিয়ার মৃত্যুর আগে কি ছিল সেই কথপথনে তা এখনো বাস্তবিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

মুনিয়াকে ঢাকার এক কলেজছাত্রী বলা হলেও, এখন পর্যন্ত কোনো কলেজে অধ্যয়নের প্রমাণাদি কোথাও পাওয়া যায়নি।  আকৃষ্ট করতেই নিজেকে কলেজছাত্রী বলে পরিচয় দিতেন বলেও জানা গেছে। এদিকে নেট দুনিয়ায় মুনিয়ার একাধিক বার্তা আদান-প্রদানের প্রমাণ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুনিয়া ও শারুনের কথোপকথনের কয়েকটি স্ক্রিনশট অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় জাতীয় সংসদের হুইপপুত্র শারুন চৌধুরীর দিকেই সকলে আঙুল তুলছে।

এ বিষয় মুনিয়ার ভাই সবুজ বাদী হয়ে শারুনের বিরুদ্ধে একটি হত্যামামলা দায়ের করেন। প্রথম মামলাটি তদন্তাধীন থাকায় এই মামলাটি আপাতত স্থগিত রেখেছেন আদালত। শারুন সাংবাদিকদের জানান, মুনিয়ার সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। হোয়াটসঅ্যাপে গত বছর তার সঙ্গে যোগাযোগ করে মুনিয়া। সূত্রে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ পাওয়া যায়, লেডি মাফিয়া পাপিয়ার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মুনিয়ার ছিল অনেকটাই মিল। আবার পাপিয়ার সঙ্গেও ছিল মুনিয়ার ওঠবস। মুনিয়া নিয়মিত যেতেন পাপিয়ার ওয়েস্টিন হোটেলেও। ওয়েস্টিন হোটেল ছিল পাপিয়ার অপরাধ জগতের অন্দরমহল। 

পাপিয়ার নামিদামি উচ্চবিত্ত খদ্দেরদের তিনি প্রথমে নিয়ে যেতেন রাজধানীর গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলে। সেখানে লাঞ্চ অথবা ডিনার শেষে তাদের নেওয়া হতো ওয়েস্টিন হোটেলের লেভেল-২২ এ এক হাজার ৪১১ বর্গফুট জায়গাজুড়ে বিলাসবহুল প্রেসিডেনসিয়াল স্যুইটে। সেখানে সুন্দরী তরুণীদের সঙ্গে কিছুক্ষণ বৈঠক করতেন পাপিয়া। এরপর পছন্দসই তরুণীকে নিয়ে গোপন কক্ষে প্রবেশ করতেন ভিআইপি খদ্দেররা। বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, পাপিয়ার সেই ডেরায় মুনিয়ার ছিল অবাধ যাতায়াত। এদিকে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মনোরঞ্জনের জন্য পাপিয়ার কাছে সুন্দরী নারী চাইতেন ক্যাসিনো কাণ্ডে গ্রেপ্তার হওয়া বেশকয়েকজন প্রভাবশালী নেতা।

তাদের চাহিদা অনুযায়ী সুন্দরী তরুণীদের পাঠিয়ে দেওয়া হতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে। পাপিয়া সুন্দরী তরুণীদের টোপ হিসেবে ব্যবহার করতেন। এদিকে মুনিয়া ছিল চতুর। নিয়মিত ওয়েশটিনে যাতায়াত থাকলেও উচ্চবিত্ত কাউকে পটাতে পারলে সেখানে তেমন যেতেন না তিনি। নেট দুনিয়ায় বেশকয়েকটি কথোপকথনের বার্তাটিই এমন ইঙ্গিত দেয়। জানা গেছে, সম্প্রতি এক প্রযোজকের হাত ধরে পরিচয় হয়েছিল চিত্রজগতে। এক নায়কের সঙ্গে লিভ টু গেদারের পর  নিজেকে বেসামাল পথে ঠেলে দেন মুনিয়া। অভিনেতা বাপ্পী রাজের সঙ্গে ছিল তার গভীর প্রেম।

মিরপুরের বাসায় নিয়মিত  একান্তে মিলিত হতো তারা। বাপ্পী রাজের সঙ্গে দির্ঘ সময়ের প্রেম ছিল মুনিয়ার। তারপর এক সঙ্গীত শিল্পীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে তার। বাপ্পী ছাড়াও একাধিক প্রেমের সম্পর্ক ছিল মুনিয়ার। সবধরনের আসরেই ওঠবস ছিল তার। সূত্রে জানা গেছে, মুনিয়ার বোন ও ভগ্নিপতির কাছে নিয়মিত টাকা পাঠাতে হতো মুনিয়াকে।  টাকার জোগান দিতে না পারলেই মুনিয়ার সঙ্গে বোন-ভগ্নিপতির ঝগড়াঝাটি হতো।  এসব বিষয় মুনিয়ার কাছের মানুষদের শেয়ার করতেন। একটি বার্তায় মুনিয়া লিখেছেন, ‘টাকার জন্য এতো চাপাচাপি করলে আমি কী করব বলো? বড় লোক কাউকে ধরে আবার ব্ল্যাকমেইলিং করা ছাড়া উপায় কী? ঢাকায় পা দেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন পার্টি সূত্রে পরিচিত অ্যারেঞ্জার যুবককে ম্যাসেজ পাঠিয়ে মুনিয়া অনুরোধ করে যে, আমার টাকার দরকার। একটা পার্টির ব্যবস্থা করো। হাতে একদম টাকা নাই। বড় আপুকে টাকা পাঠাতে হবে। হাতে টাকা নাই, চলতে পারছি না। বড় লোক একটাকে ধরতে হবে আবার’।

এসব এসএমএস বিশ্লেষণ করেই বোঝা যায় মুনিয়ার আসল রূপ। মুনিয়ার পরিবারের অনেক সদস্যদের দাবি,  মুনিয়ার বোন নুসরাত জাহান তানিয়া ও ভগ্নীপতি মিজানুর রহমানের প্রশ্রয়েই বিপথগামী হয়েছে মুনিয়া। তাদের লোভের বলি হতে হয়েছে মুনিয়াকে। মুনিয়াকে তার বোন ও ভগ্নীপতি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। মুনিয়ার বড় চাচা শাহদাত হোসেন সেলিম জানান, তাদের সঙ্গে মুনিয়াকে তানিয়ারা মিশতে দিত না। মুনিয়াকে দিয়ে ধন-সম্পদ অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে তানিয়া।

বিআলো/ইলিয়াস