পর্দার আড়ালের হিরো নাজমুল আবেদীন ফাহিম!

পর্দার আড়ালের হিরো নাজমুল আবেদীন ফাহিম!

জাকির মামুনঃ ফুল সৌন্দর্যের প্রতীক, ভালোবাসার প্রতীক৷ ফুল কে ভালোবাসেনা এমন মানুষ খুঁজে পাওয়াটা কঠিন হবে৷ কেউ ফুলের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়, কেউবা ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণে ব্যাকুল হয়, কেউবা খোঁপায় গেঁথে নেয় ফুল ,কেউবা প্রিয়জনের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করতে গিয়ে ফুল উপহার দেয়৷ ব্যক্তিবিশেষে ফুলের আবেদন ভিন্ন হলেও তা সবারই প্রিয় তা সহসা বলা যায়৷ ক্রিকেটীয় চোখে কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিম   একটি ফুলের সাথে তুলনা করলেও বেশি হবেনা!

বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য তিনি ভালোবাসার প্রতীক , অনেক ক্রিকেটারদের আদর্শ৷ সাকিব, মুশফিক, আবদুর রাজ্জাক, সৌম্য, লিটনদের মত বহু তারকাদেরও শিক্ষক তিনি৷ মুশফিক তো সবসময় গুরু বলে সম্বোধন করেন৷ দুঃসময়ে গুরুর ধারস্থ হন৷ ফাহিম সাহেবের  দরজা সবসময় সবার জন্যই উন্মুক্ত৷

ব্যক্তিবিশেষের কাছে ফুলের ব্যবহারের ভিন্নতা যেমন রয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটেও কোচ ফাহিমের পদচারণার ভিন্নতা রয়েছে৷ একজন মানুষ একাধারে কোচ, কিউরেটর, সংগঠক,ম্যানেজার, উপদেষ্টা সহ ক্রিকেটের বিভিন্ন পদে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন৷ নিজেকে নিংড়ে দিয়েছেন এদেশের ক্রিকেটের জন্য৷ তাইতো অনেক কোচও উনাকে ওস্তাদ মানতে বাধ্য এবং তা অকপটে স্বীকার ও করেন ৷

কোচ সালাহউদ্দিন বাংলাদেশের একজন ভালো কোচ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন৷ দিনশেষে কোচ ফাহিমকে  গুরু মানেন তিনি৷ ২০০১ সালে নাঈম ইসলাম, নাদিফ চৌধুরীদের ব্যাটিং কোচ  ছিলেন সালাহউদ্দিন৷ আশানুরুপ ব্যাটিং করতে না পারায় বেশ চটেছিলেন তিনি৷ উনাকে ডেকে বললেন, 'দেখো, ভালো ফলাফলের ক্রেডিট নাও ,খারাপ ফলাফলের দায়ভারটাও তোমার নেওয়া উচিৎ৷ কোচ হলো পিতার মত৷ দুঃসময়ে সন্তানদের আগলে রাখাই তার কাজ৷ ' এই টোটকা ব্যক্তিজীবনে ভালোভাবেই নিয়েছেন বলেই হয়তো সালাহউদ্দিন নামকরা কোচে পরিণত হয়েছেন৷

গণমাধ্যমে দেখেছি, আইপিলে সাকিবের ব্যাটে যখন রান আসছিলোনা টুর্নামেন্ট চলাকালীন সময়ে সালাহউদ্দিনের পরামর্শ নিতে বাংলাদেশে এসে আবার উড়াল দিয়েছিলেন সাকিব৷

' ২০১১ সাল। ক্রিকেট বোর্ডের চাকরি ছেড়ে মালয়েশিয়া যাব। স্যারের সাথে দেখা করতে আসছি। আমার মন ভাল নেই – এটা উনি ভাল করেই বুঝলেন। উনি আমাকে শুধু একটা কথা বললেন, ‘দেখ তুমি এই বয়সে যতটুকু নাম, রেসপেক্ট মানুষের কাছে পেয়েছো, আমরা এতো বছর কোচিং করিয়েও পাইনি।’ উনি জানেন কিভাবে কাকে কখন কী বলতে হবে। আমার মন সাথে সাথে ভাল হয়ে গেল।

এই হলেন আমাদের স্যার, যিনি সারা জীবন তার ছাত্রদের ভাল চিন্তা করেছেন, নিজে সব সময়ই আড়ালে থেকে গেছেন। আমার মনে হয়, বাকি জীবনটাও হয়তো আড়ালেই থাকবেন।'

কয়েকমাস আগে নিজের ফেইসবুকে  গুরুকে নিয়ে এমন কথাগুলো সবার কাছে শেয়ার করেন দেশের অন্যতম কোচ সালাহউদ্দিন৷

বাংলাদেশের টেস্ট দলের প্রথম অধিনায়ক, দুইবারের নির্বাচিত(মানিকগঞ্জ-১)সংসদ সদস্য , বাংলাদেশ ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন(কোয়াব)- এর প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক নাঈমুর রহমান দুর্জয় ও উনার ছাত্র৷

২০১৯সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে বিসিবি থেকে চাকুরির ইতি টানেন তিনি৷ ২০০৫ সালে হাই পারফরম্যান্স(এইচপি) টিমের প্রধান কোচ হিসেবে কাজ শুরু করে পরবর্তীতে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের কোচ, ম্যানেজার, ন্যাশনাল গেমস ডেভেলপমেন্টের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেন। দক্ষতার সাথে বাংলাদেশের গেমস ডেভেলপমেন্ট বিভাগটি দীর্ঘ দশবছর দেখভাল করেছেন তিনি৷ কিন্তু ২০১৯ সালের এপ্রিলের দিকে হঠাৎ এই পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে  নারী ক্রিকেট দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

নামমাত্র ইনচার্জ পদ নিয়ে ইচ্ছের বিরুদ্ধে ও নিরলস কাজ করে গেছেন এবং এশিয়া কাপের মত বড় সাফল্যের পিছনে এই মানুষটির শ্রম রয়েছে৷ তাঁর কাজের ক্ষেত্র ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে এবং পদের অবনমন এমন উপলব্ধির ভিত্তিতে বিসিবি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন৷ অবশেষে বিসিবির সাথে ১৪ বছরের ইতি টানেন৷ ভেতরে একটা অভিমান কাজ করেছিলো৷ কারও প্রতি আঙুল না তুলে তাই নিজের ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে সরে গেলেন৷ জ্ঞাণী মানুষজন এমনই হয়, যুগযুগ ধরে তারই প্রমাণ মেলে৷

বিসিবির সাথে কাজের ইতি টেনে আবার আপন ঘর, ক্রিকেটার তৈরির অন্যতম প্লাটফর্ম বিকেএসপিতে ফিরে গেলেন তিনি৷ কাজের পূর্নস্বাধীনতা পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েই তিনি যোগদান করেন৷  এখন  তিনি  কোচ হিসেবেই কাজ করছেন বিকেএসপিতে৷ বিকিএসপিতে যোগ দেওয়া প্রসঙ্গে  তিনি  জানান, ‘১৪ বছর পর আমি বিকেএসপিতে ফিরছি যার মূল কারণ ওখানকার উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা আমাকে কাজের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা দিচ্ছে। এটা আমাকে বেশি উৎসাহী করেছে, বিসিবিতে যেখানে আমার কাজের পরিধি ক্রমশই ছোট হয়ে এসেছিল।’

কাজকরা মানুষগুলো সবসময় কাজ করেই আনন্দ পান এবং স্বাচ্ছন্দবোধ করেন৷ আরও ৫-৭  বছর কাজ করার সক্ষমতা আছে বলে তিনি মনে  করেন৷ শেষ সময়েও গৌরবের সাথে কাজ করে যেতে চান সময়ের সেরা এই ক্রিকেট কোচ৷ ব্যক্তিগত প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশের ফলাফল যাই-ই হোক না কেনো, নিজের ক্যারিয়ারের শেষ সময়টুকুতেও ভালোকিছু করে দেখাতে চান৷

বিআলো/ইলিয়াস