বয়োঃবৃদ্ধ পিতার কাঁধেই ৪ প্রতিবন্ধী

বয়োঃবৃদ্ধ পিতার কাঁধেই ৪ প্রতিবন্ধী

চট্টগ্রাম ব্যুরো: টিনের ছাউনির এক টুকরো ঘর। সামনে ছোট পরিসরের একটি আঙিনা। এখানেই পা এড়িয়ে দিয়ে বসে আছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী আবদুল মালেক (৩৪)। ঘরেই মাটিতে বসে আছেন তারই আরেক ভাই অন্ধ প্রতিবন্ধী নুরুল আবছার (২৬)। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়া তাদের বয়োঃবৃদ্ধ পিতা আবদুস সালাম (৮৬) ঘরের ভেতর বসেই দিনাতিপাত করছেন। এই এক ঘরেই তার চার প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘ সংগ্রামের জীবন তার। চট্টগ্রাম মহানগরের পাহাড়তলী থানাধীন উত্তর সরাইপাড়া ছদু মাঝির বাড়ি এলাকার বৃদ্ধ আবদুস সালামের নয় সন্তান। এর মধ্যে পাঁচ সন্তানই প্রতিবন্ধী। একজন শারীরিক ও চারজন অন্ধ প্রতিবন্ধী। শারীরিক ও অন্ধ প্রতিবন্ধী মো. নুরুল ইসলাম ২০১৩ সালে মারা যান। বেঁচে থাকা শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেন আবদুল মালেক (৩৪) এবং অন্ধ প্রতিবন্ধীরা হলেন মেহরাজ খাতুন (৩৬), কামরুন নাহার (২৮) ও নুরুল আবছার (২৬)। বর্তমানে বয়োঃবৃদ্ধ পিতার কাঁধেই আছে চার প্রতিবন্ধী। 

তাদের পিতা আবদুস সালাম বলেন, ‘মহান আল্লাহর কী রহমত আমি জানি না। নয় সন্তানের মধ্যে পাঁচজনই প্রতিবন্ধী। জন্ম থেকেই তারা অন্ধ। প্রতিনিয়তই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এবং অনেক কষ্টে তাদের লালন পালন করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আমার ও স্ত্রীর পরিবারের মধ্যে কেউ অন্ধ ছিল না। কিন্তু স্রস্টার কি কৃপা আমার ঘরের পাঁচ সন্তানই অন্ধ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। জানা যায়, ইতোমধ্যেই চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের আজিমপুর গ্রামের একই পরিবারের চার বোনের অন্ধত্বের কারণ নির্ণয় করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদের উদ্যোগে চার বোনসহ পুরো পরিবারের রক্ত সংগ্রহ করে সুইজারল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুরের অত্যাধুনিক ল্যাবে রক্ত পরীক্ষা করা হয়। নমুনা পরীক্ষায় তারা ‘কনজিনেটাল এমারসিস’ রোগে আক্রান্ত বলে শনাক্ত করা হয়। বিষয়টি তত্ত্বাবধান করেন সুইজারল্যান্ডের লসন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল জেনেটিক বিভাগের প্রধান ড. জহিরুল আলম ভুঁইয়া। 

এক পরিবারে চারজন প্রতিবন্ধী প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদ বলেন, একই পরিবারের পাঁচজন প্রতিবন্ধী হওয়ার ঘটনাটি আমাদের জানা ছিল না। তবে ইতোমধ্যে একই পরিবারের চার বোনের জন্মান্ধ হওয়ার কারণ নির্ণয়ে সফল হয়েছি। ফলে এ তাদের ব্যাপারেও আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করব। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে তাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার বিভাগে কিছু নমুনা পরীক্ষা করা হবে। সেখানে যদি চূড়ান্ত ফল পাওয়া যায় সে অনুযায়ী রোগের ব্যাপারে পরবর্তী ব্যবস্থা নেব। 

সরেজমিন সরাইপাড়ায় তাদের ঘরে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিবন্ধী চার সন্তান নিয়ে অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন তাদের পিতা। নিজের অসহায়ত্বের কথা বর্ণনা দিয়ে পিতা আবদুস সালাম বলেন, একজন পিতা হয়ে প্রতিবন্ধী সন্তানদের নিয়ে নিদারুণ কষ্টের মধ্যে সময় পার করছি। কত কষ্টে তাদের নিয়ে বেঁচে আছি তা মুখে বর্ণনা করার মত ভাষা আমার নেই।