ভবিষ্যত সাংবাদিকতার একমাত্র ভরসা হবে ইউটিউব জার্নালিজম : মানিক

ভবিষ্যত সাংবাদিকতার একমাত্র ভরসা হবে ইউটিউব জার্নালিজম : মানিক

সাক্ষাৎকার : সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বদলে যাচ্ছে গণমাধ্যমের গতিপ্রকৃতি, পরিবর্তিত হচ্ছে সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইউটিউব এসে বড় ধাক্কা দিয়েছে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়। ফলে সবাই এখন ঝুঁকছেন ইউটিউব জার্নালিজমে। বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশেই প্রথম ইউটিউবে সাংবাদিকতা করার ধারণা উপস্থাপন করা হয়।

সাংবাদিক আমিরুল মোমেনীন মানিক ২০১৮ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত চেঞ্জ টিভি. প্রেস এ সর্বপ্রথম ইউটিউব জার্নালিজমের আইডিয়া দিয়ে এ ধরনের সাংবাদিকতার ট্রেন্ড তৈরী করেন। বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বেই শুরু হয়েছে ইউটিউব জার্নালিজম নিয়ে নানা পরীক্ষা নীরিক্ষা।

মানিক, সাংবাদিকতার বাইরে জীবনমুখী বাংলা গানের একজন শক্তিমান কণ্ঠশিল্পী এবং লেখক। ইউটিউব জার্নালিজমের অগ্রদূত আমিরুল মোমেনীন মানিকের সাক্ষাৎকারে থাকছে এ বিষয়ের বিস্তারিত। 

বাংলাদেশের আলো: কবে থেকে ইউটিউব জার্নালিজমের ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করলেন।
আমিরুল মোমেনীন মানিক: ২০১৫ সাল থেকেই ইউটিউবে জার্নালিজমের পোকা মস্তিষ্কে অনরবত বুদ্ধিবৃত্তিক যন্ত্রণা দিচ্ছিলো। নিজের মধ্যে চিন্তার একটা খসড়াও তৈরী করলাম। সৃজনশীলতার প্রসব বেদনা নিয়ে বাংলাদেশের স্বনামখ্যাত এক পত্রিকার প্রথিতযশা সম্পাদকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। শেয়ার করলাম আইডিয়া। বললাম, ইউটিউব জার্নালিজম শুরু করতে চাই। অগ্রজ সম্পাদক প্রথমে ভড়কে গেলেন, এ আবার কী ! এটা করে টিকে থাকা যাবে কি? বিস্তারিত খুলে বলার পর তিনি বললেন, শুরু করো। ব্যর্থ যদি হও, সেটাও একটা অভিজ্ঞতা হবে। 

২০১৮ সাল। তখন আমি মাই টিভি’তে বার্তা সম্পাদক। হঠাৎ ভাবলাম, আর চাকুরি নয়। বার্তা সম্পাদকের সম্মানজনক পদ ছেড়ে দিলাম। ইউটিউব জার্নালিজমের নতুন ধারণাকে সামনে রেখে নিজেই গণমাধ্যম তৈরীর কাজ শুরু করলাম। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন স্যারকে পেলাম উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে। প্রতিষ্ঠিত হলো চেঞ্জ টিভি. প্রেস। শুরু হলো ইউটিউবে কনটেন্ট নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা নীরিক্ষা। ‘সম্পাদকীয়’ শিরোনামে প্রতিদিন দিতে থাকলাম সংবাদ পর্যালোচনামূলক কনটেন্ট। ছয় মাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে গেলো চেঞ্জ টিভি. প্রেস। অসংখ্য মানুষের সাড়া। ইউটিউব থেকে ভলো পরিমাণে উপার্জনও শুরু হলো।

ইউটিউব জার্নালিজমের কাজটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমরাই শুরু করেছিলাম। এখন ঢাকায় এ ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করেছে। উন্মোচিত হচ্ছে সম্ভাবনার অসাধারণ দিগন্ত। দলমত নির্বিশেষে সবাই আমাদেরকে স্বাগত জানালো। বিভিন্ন মত-পথের একটি সমৃদ্ধ দর্শকগোষ্ঠী তৈরী হলো, যারা চেঞ্জ টিভি. প্রেস এর ইউটিউব কনটেন্ট এর জন্য মুখিয়ে থাকেন। আমাদের পুঁজির পরিমাণ ছিলো সামান্য। কিন্তু গণমাধ্যমটির তরুণ তুর্কিদের দিনরাত পরিশ্রম ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের নির্মোহ প্রচেষ্টার কারণে আজ ইউটিউব জার্নালিজমের অনন্য উদাহরণ চেঞ্জ টিভি. প্রেস। টেলিভিশনে সাংবাদিকতা করেছি পনেরো বছর। আর ইউটিউব জার্নালিজমে দু বছর। আমার কাছে এই দু বছরের অর্জনকেই পনেরো বছরের তুলনায় বড় এবং চমকপ্রদ মনে হয়।

বর্তমানে ঐতিহ্যিক প্রতিষ্ঠান হামদর্দ বাংলাদেশে মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশনের নতুন ফরমেশন নিয়ে কাজ করছি। এর মধ্য দিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমের মধ্যে ত্রিমাত্রিক সম্পর্ক স্থাপনের একটি নবতর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
বাংলাদেশের আলো: প্রচলিত গণমাধ্যম কেন টিকবেনা বলে মনে হয় আপনার কাছে? 
আমিরুল মোমেনীন মানিক: ‘বিশ্ব-জগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে’ । এই ভাবনা আমাদের জাতীয় কবি প্রেরণার উৎস কাজী নজরুল ইসলামের। লিখেছিলেন বিশ শতকের তিরিশের দশকে।  সেই সময়ে কেউ কি ভেবেছিলেন, ইন্টারনেট বা মোবাইল ফোনের কল্যাণে গোটা দুনিয়া থাকবে হাতের মুঠোয়? হয়ত কবি’র অন্তর্দৃষ্টি তার আগাম আঁচ পেয়েছিলো।

বর্তমানে দাঁড়িয়ে মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন, প্রযুক্তির উল্লম্ফন গতির গন্তব্য কোথায়? আমরা কেউ হলফ করে বলতে পারিনা। ধারণা করতে পারি মাত্র। একুশ শতকের শুরুকে বলা হয় ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিপ্লবের কাল। তখন বলা হতো, খবরের কল্যাণে সাংবাদিকরা সবশ্রেণীর মানুষের শয়নকক্ষে ঢুকে যাচ্ছেন। আর এখন? একুশ শতকের দু দশক না পেরুতেই বলা হচ্ছে, হাতের মুঠোয় খবর। মুঠোভর্তি খবর নিয়ে প্রতিদিন মানুষ ঘুমোতে যায় আর ঘুম থেকে উঠে ।

অন্তর্জাল দুনিয়ার ব্যাপক বিকাশের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে টেলিভিশন মিডিয়া। ভেঙে গেছে তাদের দীর্ঘদিনের আধিপত্য । টিভি মিডিয়া অতীত হয়ে যাবার আগে আমাদের সামনে এসেছে বেশ কিছু টার্ম। সিটিজেন জার্নালিজম, নেট জার্নালিজম, মোবাইল জার্নালিজম। বিকশিত হবার আগেই এ টার্মগুলো ছড়িয়ে গেছে বিদ্যুৎ প্রবাহের মতো। হালসময়ে প্রবহমান নদীর গতি নিয়ে হাজির হয়েছে ফেসবুক এবং ইউটিউব জার্নালিজম।

বড় কথা হলো, মানুষের কাছে যে মাধ্যম সবচেয়ে সহজলভ্য সেটিই আদরণীয়। টেলিভিশন চ্যানেলের শিডিউলের কাছে বন্দি না থেকে ইউটিউব মানুষকে উপসংহারহীন স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। এটাকে পশ্চিমা দুনিয়ার প্রযুক্তিবিদদের কেউ কেউ ‘মানসিক মুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মানুষ, যখন সময় পাচ্ছে ইউটিউব থেকে তার প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নিচ্ছে। কেন শিডিউলবন্দি হয়ে অপেক্ষা করবেন টিভি’র খবরের জন্য! এরকম পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে ভেবেছিলেন, অনলাইন টেলিভিশনের ধারণা অপরিহার্য হয়ে উঠবে। পরিণত হবে ইন্ড্রাস্টিতে। কিন্তু না, অনলাইন টিভিগুলোও যখন প্রচলিত টিভি চ্যানেলের মতো শিডিউল দিয়ে নিউজ বা অনুষ্ঠান প্রচার করে মানুষকে সময়ের মধ্যে বেঁধে দিচ্ছে, তখন দর্শক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এ মাধ্যম থেকে।

এ কারণে অনলাইন টিভি ক্যাটাগরির কোন গণমাধ্যম এখনো বাংলাদেশে দাঁড়াতে পারেনি বা সম্ভাবনা তৈরী করতে পারেনি। ফলে কী হয়েছে, দর্শকরা সরাসরি বেছে নিয়েছেন ইউটিউবকে।  কারণ এখানে কোন শিডিউল নেই, ধরাবাঁধা সময় নেই, এক বছর আগের তথ্যটিও তারা খুব সহজে ইউটিউব থেকে খুঁজে নিতে পারছে ।

ফেলে আসা ৩ বছরকে যদি পর্যালোচনার আলোয় রাখি, তাহলে দেখবো এখন সব আলোচিত খবরের প্রথম উৎসই হচ্ছে ফেসবুক বা ইউটিউব। সুতরাং আপাতত এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, গণযোগাযোগের নতুন মাধ্যম আবিস্কৃত না হওয়া পর্যন্ত একচ্ছত্র আধিপত্য করবে ইউটিউব।

বাংলাদেশের আলো: ইউটিউব জার্নালিজমের ভবিষ্যত কতটুকু?
আমিরুল মোমেনীন মানিক: কাগজের পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল বিলুপ্তির এই সন্ধিক্ষণে নেটওয়ার্ল্ডে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে ‘নিউজ এন্ড ভিউজ কনটেন্ট’। বলা হচ্ছে, যাদের হাতে যত ইনফরমেটিভ কনটেন্ট থাকবে, আগামীর পৃথিবী তারাই নিয়ন্ত্রণ করবে। প্রোডাক্ট হিসেবে কনটেন্ট আর প্লাটফর্ম হিসেবে ইউটিউব-ফেসবুক এখন সংবাদ দুনিয়ায় নতুন আলো ছড়াচ্ছে। টিভি চ্যানেলগুলো অনেকটা বাধ্য হয়েই তাদের ইউটিউবকে শক্তিশালী করছে। অস্তিত্বের প্রয়োজনে।

প্রযুক্তিবিদরা বলেন, এক সময় হয়ত টিভি চ্যানেলের স্যাটেলাইট সম্প্রচারের বিলুপ্তি ঘটবে। তখন টিভি চ্যানেলগুলোকে চূড়ান্তভাবে আশ্রয় নিতে হবে ইউটিউবে। দেশের একটি স্যাটেলাইট চ্যানেল সম্প্রতি তাদের ইউটিউব থেকে সর্বোচ্চ আয় করেছে। এ খাত থেকে তাদের আয়ের পরিমাণ মাসে ১ কোটিরও বেশি টাকা। আমাদের নিউজ ইন্ডাস্ট্রিতে এটা মাইলফলক ঘটনা।

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এক একটি ইউটিউব চ্যানেল হলো এক একটি গণমাধ্যম। কেউ যদি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটি তথ্যপ্রচারের কাজে ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে সেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। এ বাস্তবতায় এখন একজন সাংবাদিক আর রিপোর্টারের ভূমিকায় থাকছেন না, হয়ে উঠছেন ‘নিউজ কনটেন্ট প্রোভাইডার’।

বাংলাদেশের আলো: ইউটিউব জার্নালিজমের চ্যালেঞ্জ কী?
আমিরুল মোমেনীন মানিক: ফেসবুক-ইউটিউবে ফেইক নিউজের ভয়ংকর ছড়াছড়ি থাকে। সামাজিক মাধ্যমগুলোর মারাত্মক অপব্যবহার হয়। এসবে পরিকল্পিতভাবে তথ্যবিকৃতি করে লাগামহীন বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসও চলে। যারা এটা করেন, দিনশেষে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নেমে যায় তলানিতে। তবুও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, অনিবার্যভাবে সাংবাদিকদের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে ইউটিউব। দর্শকপ্রিয়তার মাপকাঠিতে এখন অর্থও প্রদান করছে দু’টো সামাজিক মাধ্যমই। গুগল এডসেন্সের মাধ্যমে প্রতি মাসের নির্দিষ্ট সময়ে সেসব অর্থ সরাসরি চলে আসছে ব্যাংক একাউন্টে। পাশাপাশি দেশীয় বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো বর্তমান সময়ে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে ফেসবুক-ইউটিউবে। সুতরাং আগামী ম্যাস্ মিডিয়া’র এই ডেসটিনি’কে যারা আয়ত্ব করতে পারবে, তারাই টিকে থাকবে এবং নেতৃত্ব দেবে।

বাংলাদেশের আলো: আপনার মতে, একসময় প্রচলিত সব মিডিয়াই ইউটিউব জার্নালিজমে রূপান্তর করবে নিজেদের। তাহলে এ মাধ্যমে পেশাদারিত্ব অর্জন করতে করণীয় কী?
আমিরুল মোমেনীন মানিক​​​​​​​: অভূতপূর্ব এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবার আগে অবশ্যই বেশ কিছু বিষয়ে আমাদের নজর দেওয়া উচিৎ।


* ইউটিউব-ফেসবুকের কারিগরী বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ গ্রহণ।
* মাধ্যম দু’টিতে তথ্য প্রচার করতে পারদর্শি হওয়া।
* প্রচলিত গণমাধ্যমের মতো এখানেও পেশাদারিত্ব অক্ষুন্ন রাখা।
* শুধু জার্নালিস্ট হিসেবে নয়, ‘নিউজ কনটেন্ট প্রোভাইডার’ হিসেবে যোগ্য হয়ে উঠা।
* সময়কে ধারণ করে মানুষের প্রত্যাশা’কে গুরুত্ব দেওয়া।
* ‘সোশ্যাল মিডিয়া নিউজ মার্কেটিং’ এর কৌশল আয়ত্ব করা।
* স্বনির্ভর হওয়া অর্থাৎ একই সঙ্গে ক্যামেরা পরিচালনা, ভিডিও এডিটিং এবং রিপোর্টিং এর দক্ষতা অর্জন করা।
* কাট-কপি-পেস্ট নয়, বরং শেকড়ে গিয়ে তথ্যানুসন্ধান করা।
* সাংবাদিকতার ইথিকস্ লঙ্ঘন না করা।
* সোশ্যাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠার চেষ্টা করা।